1. khaircox10@gmail.com : admin :
মা-মেয়েকে এক রশিতে বেঁধে নির্যাতনঃ নেপথ্যে কি? - coxsbazartimes24.com
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

মা-মেয়েকে এক রশিতে বেঁধে নির্যাতনঃ নেপথ্যে কি?

  • আপডেট সময় : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০
  • ১৭১ বার ভিউ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গত ২১ আগস্ট দিনদুপুরে চকরিয়া উপজেলার হারবাংয়ে মা-মেয়ের কোমরে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাটি কেন ঘটলো, তা জানতে সবার আগ্রহ।

শোনা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কথা।

চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম মিরান ওই দিন দুপুরে ঘটনাস্থলে না থাকলেও তার নির্দেশে ঘটনার সুত্রপাত। দ্বিতীয় দফায় বিকালে পরিষদে নিয়ে গিয়ে মা-মেয়েসহ ৫ জনকেই মেরেছেন তিনি।

গরু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে প্রচার পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ক্ষেপেছিল এলাকাবাসী।

গরুর মালিক উত্তর হারবাং বিন্দারবানখীল এলাকার মাহবুবুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম, ইমরান হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দিন ও জিয়াবুল হকের ছেলে নাছির উদ্দিন মা-মেয়েকে রশিতে বাঁধার ঘটনার মূল নায়ক।

ঘটনার জন্য চৌকিদার (গ্রাম পুলিশ) আমির হোসেন, নুরুল আমিন ও আবুল হোসেনকে দোষারুপ করছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।

তবে, গরু চুরির কারণে এমন ঘটনাটি ঘটেছে বলে সবচেয়ে বেশি প্রচার পায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনার শিকার মা-মেয়েসহ সবাই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চিহ্নিত গরুচোর ও মাদক কারবারি। তারা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কুখ্যাত এজলাস ডাকাত ও মাদক সম্রাজ্ঞি রবিজার বংশধর।

তাদের বর্তমান নিবাস রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ৩নং ইছাখালি ওয়ার্ডের আদিলপুর গ্রামে। তবে তারা বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার এলাকার ভাড়া বাসায় থেকে মাদক ব্যবসা করেন। তারা কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ফেনসিডিল, কক্সবাজার থেকে ইয়াবা ও কাপ্তাই থেকে চোলাই মদের চালান চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাচার করে থাকে।

মাঝে মধ্যে সুযোগ বুঝে সিএনজি অটোরিক্সা ও মিনি ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে গরু ছাগল চুরি করে সটকে পড়ে।

প্রায় সময় তাদের বাড়িতে হঠাৎ গরু ছাগলের দেখা মিলতো আবার কয়েকদিন পর সেগুলো বিক্রি করে দিতো বলে আশপাশের লোকজন জানান। আদিলপুর গ্রামে মাদক কারবারি ও চুরি চামারির পরিবার নামেই অধিক পরিচিত এই পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের পহরচাঁদা এলাকায় নির্যাতনের শিকার পারভিন আক্তার (৪০) এর প্রকৃত নাম সাজেদা বেগম প্রকাশ সাজ্জনি। সে পুলিশের কাছে প্রকৃত নাম গোপন করেছে। তার স্বামীর নাম মনছুর আলী হলেও সেখানে লিপিবদ্ধ করেছেন আবুল কালাম নামে।

তার ছেলের নাম মো. জোবায়েদ (২১) এর প্রকৃত নাম গোপন করে লিখেছেন মো. এমরান। নির্যাতনের শিকার অপর দুই মেয়ে হলেন সেলিনা আকতার শেলি (২৮) ও রোজিনা আক্তার (২৩)। তারাও মায়ের সাথে মাদক ব্যবসা ও গরু ছাগল চুরির সাথে জড়িত।

অথচ চকরিয়া থানায় আটকের পর তারা ভুয়া নামের পাশাপাশি ঠিকানা বলেছিলেন পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের শান্তিরহাট এলাকায়। তবে সাজেদা বেগমের স্বামী মনছুর আলীর গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা থানার পড়ৈকোড়া ইউনিয়নের শান্তিরহাট এলাকায়। সাজেদা বেগমের ছোট ভাই মো. নাজিম উদ্দিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালি এলাকার মো. আহমদ কবির জানান, সাজেদা বেগম প্রকাশ সাজ্জনি রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়নের কুখ্যাত মৃত এজলাস ডাকাতের মেয়ে। কর্ণফুলি নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তারা ইছাখালি আদিলপুর গ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বসতি গড়েন প্রায় দুইযুগ আগে। সাজ্জনির মা মৃত রবিজা খাতুনও ছিলেন রাঙ্গুনিয়ার শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞি। মায়ের হাত ধরেই পরিবারের সবাই এখন মাদক কারবারের সাথে জড়িত। সাজেদা বেগম সাজ্জনির তিন মেয়ে এক ছেলের সবাই আন্তজেলা মাদক কারবারি বলে এলাকায় প্রচার আছে।

তিনি বলেন, কয়েকমাস আগেও সাজেদা বেগম সাজ্জনি চন্দনাইশ উপজেলায় গরু চুরি করে পালানোর সময় গ্রামের লোকজন ধরে ফেলেন। পরে স্থানীয়রা শালিস করে মুচলেখা দিয়ে ছাড়া পান। এভাবে কিছুদিন পরপর গরু ছাগল নিয়ে আসতো আদিলপুরের বাড়িতে। এবং সেগুলো বিক্রি করতো এলাকায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় চকরিয়ায় নির্যাতনের ছবি দেখে তাদের চিনতে পেরেছেন বলে জানান আহমদ কবির।

আদিলপুর গ্রামের ইলিয়াছ তালুকদার জানান, সুচতুর এই মাদক কারবারি ও চোর পরিবারের সকলেই যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তখন সঠিক নাম ঠিকানা গোপন রেখে ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে পাড় পেয়ে যান। চকরিয়ায়ও গণপিটুনির পর পুলিশের কাছে সঠিক নাম ঠিকানা গোপন করেছেন পেশাদার এই মাদক ব্যবসায়িরা।

তারা রাঙ্গুনিয়ায় কোন অপরাধ করে পালিয়ে যান শহরের লালখান বাজারের বাসায়, সেখানে মাদকের কোন অভিযান চললে গা ঢাকা দেন সাজ্জনির স্বামি মনছুরের আনোয়ারা থানার ছত্তারহাটের বাড়িতে। এজলাস ডাকাতের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই আন্ত:জেলা মাদক ব্যবসায়ি বলে জানান ইলিয়াছ তালুকদার।

এদিকে, মা-মেয়ের কোমরে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় হারবাং ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম মিরানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় মামলা হয়েছে।

অজ্ঞাতনামা আসামী রয়েছে আরও ২০/৩০ জন। যার থানা মামলা নং -২২।

মামলার অন্যান্য আসামীরা হলেন- উত্তর হারবাং বিন্দারবানখীল এলাকার মাহবুবুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম (১৯), ইমরান হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩০) ও জিয়াবুল হকের ছেলে নাছির উদ্দিন (২৮)।

মামলার বাদী পারভিন বেগম এজাহারে উল্লেখ করেছেন, তারা রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও বর্তমানে তারা স্বপরিবারে পটিয়া উপজেলার শান্তির হাট কুসুমপুরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

গত ২১ আগস্ট দুপুরে পারভিন বেগম তার ছেলে এমরান, ছেলের বন্ধু ছুট্টু এবং দুই মেয়ে রোজিনা আক্তার ও সেলিনা আক্তার শেলীকে নিয়ে চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাটের হায়দারনাশি এলাকায় ছোট মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন।

তারা প্রথমে মাইক্রোবাসযোগে সাতকানিয়ার কেরানি হাটে আসেন।

সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত বেবি ট্যাক্সিতে করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে দক্ষিণ দিকে চকরিয়ার ডুলাহাজারার ইউনিয়নের মালুমঘাটের পূর্ব পাশ থেকে রওনা দেন।

তারা চকরিয়ার হারবাং পহরচাঁদা লাল ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে দুইটি মোটর সাইকেল নিয়ে ৬ জন লোক তাদেরকে ধাওয়া দেন। এতে চালক ভয় পেয়ে সিএনজি চালিয়ে হারবাং পহর চাঁদা এলাকায় নির্মাণাধীন রেল লাইনের পাশে নিয়ে যায়। সেখানে ওই মোটর সাইকেল আরোহীরা তাদেরকে আটক করে কিল ঘুষি মারতে থাকে। এসময় ওই অভিযুক্তরা তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন সেট কেড়ে নিয়ে নেয়। এরপর তাদেরকে কোমরে রশি বেঁধে মারতে মারতে রাস্তায় হাঁটিয়ে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যান।

মামলার বাদী তার মামলায় আরও উল্লেখ করেছেন, ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম মিরান তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন। প্রথমে পারভিন বেগমের মেয়ে সেলিনা আক্তার শেলীকে তলপেটে লাথি মারেন। এরপর চেয়ার দিয়ে মারতে থাকেন। একপর্যায়ে তার হাতে থাকা লাঠি দিয়েও আঘাত করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদের পাশের হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান।

পারভিন বেগম জানান, গরু চুরির ঘটনা মিথ্যা ও অপবাদ। তাদেরকে গরু চুরির অপবাদ দিয়ে মারধর করে কোমরে রশি বেঁধে প্রকাশ্যে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও অপমান করার উদ্দেশ্যে আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে এ ঘটনা করেছে।

তবে, কেউ অপরাধ করলেও শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আরেকটা অপরাধ। বিচার বা শাস্তি করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। হারবাংয়ে গরু চুরির অভিযোগে জন্ম দেয়া দ্বিতীয় ঘটনাটি আরো জঘন্য। যা একদিকে শ্লীলতাহানি, অপরদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

আলোচিত এই ঘটনায় যারা জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবী স্থানীয়দের।

খবরটি সবার মাঝে শেয়ার করেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সব ধরনের নিউজ দেখুন
© All rights reserved © 2020 coxsbazartimes24
Theme Customized By CoxsTech